তোমাদের বিয়ে হল ফাগুনের চৌঠা, অক্ষয় হয়ে থাক্ সিঁদুরের কৌটা। সাত চড়ে তবু যেন কথা মুখে না ফোটে, নাসিকার ডগা ছেড়ে ঘোমটাও না ওঠে; শাশুড়ি না বলে যেন "কী বেহায়া বৌটা'। "পাক প্রণালী'র মতে কোরো তুমি রন্ধন, জেনো ইহা প্রণয়ের সব-সেরা বন্ধন। চামড়ার মতো যেন না দেখায় লুচিটা, স্বরচিত ব'লে দাবি নাহি করে মুচিটা; পাতে বসে পতি যেন নাহি করে ক্রন্দন। যা-ই কেন বলুক-না প্রতিবেশী নিন্দুক খুব ক'ষে আঁটা যেন থাকে তব সিন্দুক। বন্ধুরা ধার চায়, দাম চায় দোকানি, চাকর-বাকর চায় মাসহারা-চোকানি-- ত্রিভুবনে এই আছে অতি বড়ো তিন দুখ। বই-কেনা শখটারে দিয়ো নাকো প্রশ্রয়; ধার নিয়ে ফিরিয়ো না, তাতে নাহি দোষ রয়। বোঝ আর না-ই বোঝ কাছে রেখো গীতাটি, মাঝে মাঝে উলটিয়ো মনুসংহিতাটি; "স্ত্রী স্বামীর ছায়াসম' মনে যেন হোঁশ রয়। যদি কোনো শুভদিনে ভর্তা না ভর্ৎসে, বেশি ব্যয় হয় পড়ে পাকা রুই মৎস্যে, কালিয়ার সৌরভে প্রাণ যবে উতলায়, ভোজনে দুজনে শুধু বসিবে কি দু'তলায়। লোভী এ কবির নাম মনে রেখো, বৎসে। দ্রুত উন্নতিবেগে স্বামীর অদৃষ্ট দারোগাগিরিতে এসে শেষে পাক্ ইষ্ট। বহু পুণ্যের ফল যদি তার থাকে রে, রায়বাহাদুর-খ্যাতি পাবে তবে আখেরে; তার পরে আরো কী বা রবে অবশিষ্ট।
গভীর সুরে গভীর কথা শুনিয়ে দিতে তোরে সাহস নাহি পাই। মনে মনে হাসবি কিনা বুঝব কেমন করে? আপনি হেসে তাই শুনিয়ে দিয়ে যাই-- ঠাট্টা করে ওড়াই সখী, নিজের কথাটাই। হাল্কা তুমি কর পাছে হাল্কা করি ভাই, আপন ব্যথাটাই। সত্য কথা সরলভাবে শুনিয়ে দিতে তোরে সাহস নাহি পাই। অবিশ্বাসে হাসবি কিনা বুঝব কেমন করে? মিথ্যা ছলে তাই শুনিয়ে দিয়ে যাই, উল্টা করে বলি আমি সহজ কথাটাই। ব্যর্থ তুমি কর পাছে ব্যর্থ করি ভাই, আপন ব্যথাটাই। সোহাগ-ভরা প্রাণের কথা শুনিয়ে দিতে তোরে সাহস নাহি পাই। সোহাগ ফিরে পাব কিনা বুঝব কেমন করে? কঠিন কথা তাই শুনিয়ে দিয়ে যাই, গর্বছলে দীর্ঘ করি নিজের কথাটাই। ব্যথা পাছে না পাও তুমি লুকিয়ে রাখি তাই নিজের ব্যথাটাই। ইচ্ছা করে নীরব হয়ে রহিব তোর কাছে, সাহস নাহি পাই। মুখের 'পরে বুকের কথা উথ্লে ওঠে পাছে অনেক কথা তাই শুনিয়ে দিয়ে যাই, কথার আড়ে আড়াল থাকে মনের কথাটাই। তোমায় ব্যথা লাগিয়ে শুধু জাগিয়ে তুলি ভাই আপন ব্যথাটাই। ইচ্ছা করি সুদূরে যাই, না আসি তোর কাছে। সাহস নাহি পাই। তোমার কাছে ভীরুতা মোর প্রকাশ হয় রে পাছে কেবল এসে তাই দেখা দিয়েই যাই, স্পর্ধাতলে গোপন করি মনের কথাটাই। নিত্য তব নেত্রপাতে জ্বালিয়ে রাখি ভাই, আপন ব্যথাটাই।
লিখি কিছু সাধ্য কী! যে দশা এ অভাগার লিখিতে সে বাধ্য কি। মশা-বুড়ি মরেছিল চাপড়ের যুদ্ধে সে-- পরলোকগত তার আত্মার উদ্দেশে আমারি লেখার ঘরে আজি তার শ্রাদ্ধ কি! যেখানে যে কেহ ছিল আত্মীয় পরিজন অভিজাতবংশীয় কেহ, কেহ হরিজন-- আমারি চরণজাত তাহাদের খাদ্য কি! বাঁশি নেই, কাঁসি নেই, নাহি দেয় হাঁক সে, পিঠেতে কাঁপাতে থাকে এক-জোড়া পাখ সে-- দেখিতে যেমনি হোক তুচ্ছ সে বাদ্য কি। আশ্রয় নিতে চাই মেলে যদি ড়বনরঢ়নক্ষ, এক ফোঁটা বাকি নেই নেবুঘাস-তেলটার-- মশারি দিনের বেলা কভু আচ্ছাদ্য কি! গাল তারে মিছে দিই অতি অশ্রাব্য, হাতে পিঠ চাপড়াব সেটা যে অভাব্য-- এ কাজে লাগাব শেষে চটি-জোড়া পাদ্য কি। পুজোর বাজারে আজি যদি লেখা না জোটাই, দুটো লাইনেরো মতো কলমটা না ছোটাই-- সম্পাদকের সাথে রবে সৌহার্দ্য কি।